ব্রেকিং >>
ব্রেকিং >>

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | 20 বার পঠিত | প্রিন্ট

বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: শেয়ারবাজারে ব্রোকারেজ হাউস ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর স্বনিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এতে প্রতারণা ও বিভিন্ন অনিয়ম থেকে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমিতিগুলোর নিজস্ব নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি অনিয়মের ঘটনায় কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও থাকা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বনিয়ন্ত্রণ বলতে শুধু সদস্যদের ভালো চর্চায় উৎসাহিত করাকে বোঝায় না। নীতিমালা ভঙ্গ, অসদাচরণ ও অনিয়মের ঘটনায় সদস্যপদ বাতিলসহ কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানও এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলোর সক্রিয় ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, সদস্যদের স্বার্থের পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হলে স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

Responsive Ad Banner

বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিজ অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডস নামে একটি সংগঠন থাকলেও কার্যত সেটি প্রায় নিষ্ক্রিয়। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ সংগঠনটির ভোটব্যবস্থা। বিদ্যমান কাঠামোয় প্রতিটি মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য একটি করে ভোট বরাদ্দ রয়েছে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান বেশি সম্পদ পরিচালনা করে, তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষিত থাকার আশঙ্কা বাড়ে।

এ পরিস্থিতিতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে নতুন একটি সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি। বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানিয়েছেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকদের জন্য কার্যকর ও প্রাণবন্ত একটি সমিতি গঠনের সুযোগ তৈরি করতে কমিশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাবে।

তবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাতের অনেকের বক্তব্য, প্রতারণার ঘটনাগুলো মূলত মেয়াদি বা ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশি ঘটেছে। বর্তমানে এ ধরনের ফান্ডের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন ক্লোজড-এন্ড ফান্ডের অনুমোদন দেওয়া ইতোমধ্যে বন্ধ করেছে।

অন্যদিকে, বর্তমানে উন্মুক্ত বা ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের আধিক্য বেশি। এসব ফান্ডে বিনিয়োগকারীরা নিট সম্পদমূল্য বা এনএভির ভিত্তিতে যেকোনো সময় ইউনিট বিক্রি করে নিজেদের অর্থ তুলে নিতে পারেন। এ কারণে ওপেন-এন্ড ফান্ডে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম বলে দাবি করছেন ফান্ড ব্যবস্থাপকেরা।

চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে মোট ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা পরিচালিত হচ্ছিল ওপেন-এন্ড ফান্ডের মাধ্যমে। এদিকে বিএসইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিদ্যমান বিধিমালায় কাস্টডিয়ান বা সম্পদ সংরক্ষণকারীদের দায়িত্বও আগের তুলনায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

ব্রোকারদের সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ডিবিএর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংগঠনটি থাকা সত্ত্বেও তামহা সিকিউরিটিজ, মশিহর সিকিউরিটিজসহ কয়েকটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারক করে ফিন্যান্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রি রেগুলেটরি অথরিটি বা ফিনরা। ব্রোকারদের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য হলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং সিকিউরিটিজ খাতে ন্যায়সংগত ও সৎ কার্যক্রম নিশ্চিত করা।

প্রতারণা, অনৈতিক আচরণ কিংবা গ্রাহকের সম্পদের অপব্যবহারের মতো অভিযোগের ভিত্তিতে ফিনরা বিভিন্ন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ বাতিল করেছে। এর একটি উদাহরণ ২০২৩ সালে এসডব্লিউ ফাইন্যান্সিয়ালকে বহিষ্কারের ঘটনা। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের আগে শেয়ারসংক্রান্ত বিনিয়োগে পারিশ্রমিকের বিষয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা, অতিরিক্ত লেনদেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে সংস্থাটি এ পদক্ষেপ নেয়।

এ বিষয়ে বিএসইসির এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন দেশে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতি প্রাথমিক পর্যায়ে নজরদারির দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ডিবিএর কার্যক্রম মূলত সদস্যদের স্বার্থ রক্ষাকেন্দ্রিক। উদাহরণ হিসেবে তিনি লেনদেনের ক্ষেত্রে উচ্চতর ফ্রি-লিমিটের সুযোগ বাড়ানোর দাবির বিষয়টি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংগঠনটির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্রোকারের লাইসেন্স স্থগিত করা হলে সংগঠনে তার সদস্যপদও স্থগিত থাকে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা চূড়ান্তভাবে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করার বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা

বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশে ইনভেস্টর প্রোটেকশন ফান্ড বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিলও রয়েছে। ২০০০ সালের আগস্টে গঠিত এই তহবিল থেকে ব্রোকারের প্রতারণা কিংবা অর্থ ও সিকিউরিটিজ আত্মসাতের শিকার বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তহবিলের আকার সীমিত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা তাঁদের সম্পূর্ণ ক্ষতির অর্থ ফেরত পান না।

বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্রোকারকে প্রতি প্রান্তিকে পাঁচ হাজার টাকা করে এ তহবিলে জমা দিতে হয়। পাশাপাশি কনসলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্ট বা সিসিএতে রাখা আমানতের সুদ থেকে অর্জিত অর্থের ২৫ শতাংশও তহবিলে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে এই তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত একজন বিনিয়োগকারী সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। ফলে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় এ সহায়তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্রোকার ও সম্পদ ব্যবস্থাপকদের সমিতিগুলোর কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তি, অনিয়ম শনাক্তকরণ এবং অপরাধের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে তাঁরা আর্থিক ক্ষতির পর অন্তত ন্যায্য প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পান।

Facebook Comments Box

Posted ৮:৪৮ পিএম | রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com